ইয়েতি, লামা আর আন্না হাজারে

১১

রোহণ কুদ্দুস | আড্ডা

0/5 (অরেটিত)

আমাদের বৈকালিক অধিবেশন সবে শুরু হয়েছে। ফুডকোর্টে আমি, লামা আর ইয়েতি যে যার গ্লাস নিয়ে একটা কোণের টেবিল দেখে বসেছি। ভেতরের ঠান্ডা পানীয়ে গ্লাসের গায়ে ঘাম দিচ্ছে। লামা তার গ্লাসের কপাল থেকে একটু ঘাম ঝেড়ে ফেলে শুরু করল -- "এবছর ফেসবুকে ভারতীয়দের মধ্যে সবথেকে আলোচিত টপিক কী বলতো?" আমি একটু মাথা চুলকে বললাম -- "কী হতে পারে? ভারতের বিশ্বকাপ জয়?" লামা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল -- "এখনও সেই ভেতো বাঙালি টাইপ একটা চিন্তা-ভাবনা। ধোনি বিশ্বকাপ জিতলে আমার কোন কাজে লাগবে র‍্যা? আমার তাতে পেট ভরবে? থিংক বিগ। থিংক আন্না।" বোঝা গেল ফেসবুকে আন্নাজীই সবচেয়ে আলোচিত। এতক্ষণ ইয়েতি পাশের টেবিলের একটা মেয়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে নিজের গ্লাসের মধ্যে স্ট্র ঘোরাচ্ছিল। এবার মুখ ফিরিয়ে সে বলল -- "ভারতে আন্না হাজারের সংগ্রামের কথা শুনলে আমার ব্যাপক হাসি পায়।" লামা তেরিয়া হয়ে বলল -- "কেন বে? হাসি কেন পায়?" ইয়েতি তার স্বভাবসিদ্ধ স্টাইলে বলল -- "ছোটবেলায় প্যান্টের বোতাম খোলা থাকলে আমার থেকে একটু বড় জ্যাঠতুতো দাদারা বলত, ঐ ন্যাড়া তোর পোস্টাপিস দেখা যাচ্ছে।" আমি এবার সরব হলাম -- "আন্নাজি ন্যাড়াও না আর উনি ব্রিটনি স্পিয়ার্সও নন যে পোস্টাপিস দেখা যাবে। তাহলে?" ইয়েতি তার কোল্ড বাদাম শেকে সুড়ুত করে টান মেরে বলল -- "আজ দুপুরের ঘটনা। শোন তাহলে।"

ইয়েতি দুপুরের খাবারের পর গিয়েছিল একপ্যাকেট বিস্কুট কিনতে। দোকানটা আমাদের ক্যাম্পাসের মধ্যেই, ভারতের নামী একটা রিটেল চেনের আউটলেট। ইয়েতি তার বিস্কুটের প্যাকেটের সাথে আরও হাবিজাবি কিছু কিনল। চানাচুর, বাদামভাজা, বিস্কুট -- সব মিলিয়ে বিল হল ১৮৬ টাকা। ইয়েতি ২টো ১০০ টাকার নোট এগিয়ে দিল। কাউন্টারের ছেলেটা মিষ্টি হেসে সমস্ত জিনিস একটা প্যাকেটে ভরে ইয়েতিকে ৩৪ টাকা ফেরত দিল। ইয়েতি জিনিসপত্র আর টাকা নিয়ে একপাশে সরে এসে বোঝার চেষ্টা করল ব্যাপারটা। তারপর কিছু না বুঝতে পেরে আবার কাউন্টারের ছেলেটার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল -- "দাদা এক্সট্রা ২০ টাকা কী পান-বিড়ি খেতে দিলেন?"

একটু ঘাঁটতে দেখা গেল, কীভাবে যেন প্রত্যেক বিলের শেষে কম্পিউটার বাবাজি ব্যালান্স এ্যামাউন্টের সাথে ২০ টাকা যোগ করে দিচ্ছে। ফলে খদ্দেরের যা টাকা পাওনা হয়, তার থেকে ২০ টাকা বাড়তি দিচ্ছে কাউন্টারের আইনস্টাইনটা। ব্যাঙ্গালোরের গড়পড়তা দোকানদারের আই কিউ ২০-র বেশি নয়। গড়গড় করে ইংরাজিতে কথা বলছে। কিন্তু ৫০-এর সাথে ৩০ যোগ করতে বলো, ক্যালকুলেটার টেনে নিয়ে ঘ্যাটঘ্যাট করে অসভ্যের মত বোতাম টিপতে আরম্ভ করবে। তা আজকের এই লোকটাও ব্যতিক্রম কিছু নয়। মেশিন যেহেতু বলেছে ১৮৬ টাকার মাল নিয়ে ২০০ টাকা নিলে ৩৪ টাকা ফেরত দিতে হবে, অতএব সে নির্দ্বিধায় তা করে চলেছে।

ইয়েতিকে থামিয়ে দিয়ে লামা এবার সরব হল -- "তো শালা এতে আন্না হাজারে কোত্থেকে এল। এখানে আকাট দোকানদারটা যা করেছে, সেটাকে বলে ইডিওসিটি। যেটা তুই হরবখত করে থাকিস।" ইয়েতি হাত তুলে বরাভয় দিল বলল -- "তিষ্ঠো বৎস। বলছি।"

ব্যাপারটা তখন স্টোর ম্যানেজারের এক্তিয়ারে চলে এসেছে। দেখা গেল শেষ ৯০ মিনিট ধরে ব্যাপারটা ঘটেছে। মোট ৩৫টা বিলে এই ভুলটা হয়েছে। তার মানে ৩৫ জন লোক ২০ টাকা বাড়তি পেয়ে অম্লান বদনে সেটা পকেটস্থ করে হাঁটা দিয়েছে। সম্ভাবনা ৩টে।
১। ২০১২-র দিকে যত এগোচ্ছে লোকজনের অংক-টংক করার ক্ষমতা আস্তে আস্তে কমে আসছে।
২। ওপরওয়ালাদের দয়ায় পয়সা এত বেশি হয়েছে সে পকেটে ঢোকানোর আগে পয়সা গোনার প্রয়োজন হচ্ছে না।
৩। ন্যাড়া তোর পোস্টাপিস খোলা। আন্না হাজারে নিয়ে আর চিল্লাস নি বাপু। ক্ষ্যামা দে এবার।

রোহণ কুদ্দুস

লেখক

খাই, দাই, ঘুমোই, গপ্পো করি আর লিখি। ও হ্যাঁ, পড়িও বটে।

[প্রোফাইলের ছবিটা বিল ওয়াটারসনের থেকে ধার নেওয়া।]

[প্রোফাইলের ছবিটা বিল ওয়াটারসনের থেকে ধার নেওয়া হয়নি।]

জনগণ যা বলেন

আপনি যা বলেন

বেশ লিখেছ।

আম জনগণ হঠাৎ হুজুগে হামলে পড়ছে সেটা যেমন ঠিক, তেমনি আন্নার এই আপাততঃ একলা লড়ে যাওয়াটাই বা কম কিসে?

কাজেই লেখার স্টাইলটা ভালো লাগলেও, বক্তব্যটা মনঃপূত হলো না।

অবিশ্যি এটা ব্যক্তিগত আমার মত - তোমারও মনঃপূত নাও হতে পারে...।

কিশোরদা, বক্তব্য হল -- নিজেকে শোধরাও। দেশ আপনা আপনি ঠিক চলবে। নিজে যা পাই পকেটে ঢোকাই আর নেতাগুলোই শুধু জোচ্চর -- এমন কথা ভালো শোনায় না।

৪. লোকেরা হাঁড়ি চাপিয়ে বাজারে যায়, ফেরত গোণার সময় পায় না।
৫. যে বাজারে বাধা খদ্দেরের জন্য তিরিশ টাকা কেজি আর অনিয়মিত খদ্দেররের জন্য পঁয়ত্রিশ টাকা বেশি, কিংবা বাঙালি ক্রেতার জন্য এক পিস ফুলকপি পঞ্চাশ টাকা আর মারোয়াড়ি খদ্দরের জন্য সেই এক পিস ফুলকপিই আশি টাকা সেখানে কুড়ি টাকা ফেরত বেশি খদ্দেরের সাড্ডা হক।
পোস্টাপিস তো খোলাই, না হলে আর আন্না হাজারে কে নিয়ে চেল্লামেল্লি কেন?

Bimbisar মন্তব্য5 মাস আগে

এ যুগে বিবেকানন্দ আসলেও তাকে সরকার নিশ্চয় ইনকাম ট্যাক্সের অওতায় ফেলে নাকানি চোবানি খাওয়াতো নয়তো চরিত্র হনন...জানি শর্ষের মধ্যেই ভুত কিন্তু একটা আশা যে একটা রুল তৈরি হলে কিছু তো রাঘব বোয়াল ফাসবে...তাতে মন্দ কি?

এক্স্যাক্টলি, বিম্বি ও রোহণ,

আমরা সুযোগ পেলেই হাতা মারছি এদিক ওদিক, অথচ অবসর বিনোদন মানেই সততার ঢেঁকুর তুলে - উঠতে বসতে নেতাগুলোর গুষ্টি উদ্ধার করছি।

পরের বার আবার সকাল সকাল লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছি এই নেতাগুলোকেই! (বাঁ আঙুলে নখের আগায় গণতান্ত্রিক চুমুর বেগুনি দাগ নিয়ে)।

ব্যস, দায়িত্ব খালাস!

অথচ একা একটা লোক মাঝে মধ্যেই না খেয়ে লড়ে যাচ্ছে একটা সাংবিধানিক রেমেডির জন্যে। নো বিপ্লব, নো বন্দুক, নো বাইরের আদর্শ।

হুজুগে না মাতি, আন্নার মিছিলে সামিল না হই, কিন্তু মানসিক সমর্থনটুকু (তাতে কার কি এলো - গেলো) জানাতে কার্পণ্য করার মানে হয় না।

প্রথম প্রথম আন্নার আন্দোলন নিয়ে দারুন একটা অনুভূতি হয়েছিলো।কিন্তু এখন দেখছি, মানুষটা সত কিন্তু ‘অ্যাপোলটিক্যাল’ তো নন... আর ‘নাগরিক সমাজের প্রতিভূ’ পলিটিক্যাল হলে ‘আর ভালো লাগে না’।
আজকাল মনে হয়, ‘আইন বদলানোর জন্য চেল্লামেল্লি’ না করে, এরকম আন্দোলন ‘ইস্যুভিত্তিক’ করলে ‘আমাদের সাধারন মানুষের উপকার’।
যেমন,
১) সরকারী ও বেসরকারী অফিসের সামনে চেইন-অনশন (নাগরিক সমাজের), দূর্ণিতির বিরুদ্ধে।দূর্ণিতি হীন স্বচ্ছতার দাবী ।
২)সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতালে সামনে ধর্ণা
৩)সংরক্ষনের ‘বেঠিক’ প্রয়োগ নিয়ে ধর্ণা
৪)পলিটিক্সের দুর্বিত্তায়ন নিয়ে ধর্ণা
৫) স্থানীয় এলাকার ‘ছোট ছোট দাবী’ নিয়ে ধর্ণা।

এই সব ‘নাগরিক’ দাবী।এসবের জন্য ‘নতুন আইন’ দরকার নেই।দরকার ‘এক্সিসটিং আইনের’ সত ও স্বচ্ছ প্রয়োগ।আর তার জন্য ‘অ্যাপোলটিক্যাল’ নাগরিক সমাজের ‘প্রতিভূ’ হিসেবে কেউ আসলে সবসময়ে স্বাগত।সেই দায়িত্ব কি টিন আন্না পালন করতে পারলেন?

অতনু, চলো তুমি আর আমি ধর্নায় বসি। লোক কম পড়লে বা ব্যাপারটা ক্লিক না করলে সি এম-এর থেকে টিপস নেব। ধর্না নিয়ে ওনার অভিজ্ঞতার শেষ নেই।

জানি না আন্নাজীকে নিয়ে আরোও কতদিন আমরা আলোচনা করে যাবো। এ দেশে যা সম্ভব নয়, তার পেছনে সকলে মিলে দৌড়চ্ছে। হে আন্না !!

একটা খবর দিই। আমার ইয়েতি, লামা আর সফোর এই সিরিজ একটা মাসিক পত্রিকা কলাম হিসাবে ছাপবে বলেছে।

আন্তরিক অভিনন্দন, রোহণ। কোন পত্রিকা জানিও।

চিচিং ফাঁক


লেখকের সমস্ত