অধিকার, ভাগ্য ও নিয়তি

১৮

হিমাদ্রী শেখর দত্ত | আলোচনা

0/5 (অরেটিত)

যদি আমিরাজার ঘরে জন্মাতাম, তাহলে আমার হাতে থাকতো রাজপুত্রের অধিকার। উঠতে বসতে হুকুম তামিল করার নকোর/ চাকর, খানা পিনা, মৌজ মস্তি। কিছুটা বড় হবার পরে রাজপাট। কিন্তু এটা সবসময় সত্যি হয় না। রাজপুত্রের অধিকার স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে গৌতম, মহামতি বুদ্ধ হয়েছিলেন।রামচন্দ্র বনবাসে গেছিলেন, যুধিষ্ঠির স্ত্রী-ভাই-মা সহযোগে অজ্ঞাতবাসে পরিচয়হীন ভাবে জীবন কাটিয়েছেন। কিন্তু এদের সকলেরই অধিকারের পরিধির মধ্যে এসব হবার কথা ছিলো না। কিন্তু হয়েছে।
আবার রাজমাতার কোক থেকে জন্ম নেবার পরেও, রাজপুত্র না হয়ে মহাদানী কর্ণ সুতপুত্র হিসেবে পরিচিতি পেলেন। জ্যেষ্ঠ পান্ডবের মর্যাদা কখনও পেলেন না। কিন্তু এসব তার জন্মসূত্রে পাওয়া অধিকারের মধ্যেই ছিলো। পান নি। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণও সব জানা সত্ত্বেও তাঁকে এই লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি দিতে পারেন নি। তিনি নিজেও ভগবান হয়েও মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত থেকে গেলেন তার ছোট্টবেলাতে। তিনি পালিত হলেন অন্য মায়ের কাছে, অন্য ঘরে, অন্য পরিবেশে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে অধিকার তা সে জন্মসূত্রেই হোক বা অর্জিতই হোক সবসময় কাঙ্খিত ফল দেয় না। তার নির্দ্ধারিত রাস্তায় চলে না। তাহলে কে বা কারা এই সব কন্ট্রোল করে? এর কোন সহজ জবাব আমার জানা নেই। এটা মহাকালের সময়ের চক্রে এক জটিল গণণা। বিধাতা পুরুষের হাতের খেলা, যা পরিচালনা করে হয়তো ভাগ্য আর নিয়তি। ‘ভাগ্যং ফলতিঃ সর্বোত্রঃ’ বা ‘নিয়তি কেনঃ বাধ্যতে’ এ সব তো আমরা চিরকাল শুনে আসছি। নিয়তির চালনায় আর ভাগ্যের সাহায্যে ফলাফল স্থির হয়ে আছে আমাদের কর্মের অনেক আগে থেকে। আগেকার দিনে মুনীঋষি’রা ত্রিকালজ্ঞ ছিলেন বলে কথিত। তাঁরা রামচন্দ্র আসার আগেই রামায়ণ বর্ণনা করেছেন, মহাভারতের কথা ব্যাসদেব আর গণেশ এক সিটিং-এ বসে লিখে ফেলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জানতেন তাঁকে কখন কি কি রুপে প্রকট হতে হবে, মহাভারতে তাঁর কি রোল হবে, কুরুক্ষেত্রের মাঠে তাঁরই অংশ হিসেবে জন্মিত অর্জুনকে গীতার পাঠ দেবেন সমস্ত পৃথিবীর জন্যে।
অধিকার হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে, আর প্রায়শঃই হয়ে থাকে। আমি তার জন্যে ভাগ্য আর নিয়তিকে মূল মানি। ভাগ্য আর নিয়তির মধ্যে কি তফাত সেটা বোঝানো খুব কঠিন। এটা একটা মানসিক কনসেপ্টের ব্যাপার। আমার মতে ভাগ্য কথাটা আমরা ভালো বা খারাপ সবক্ষেত্রেই ব্যবহার করি, কিন্তু নিয়তিকে আমরা ব্যাপক অর্থে এবং কিছুটা নেগেটিভ অর্থেই ব্যাবহার করে থাকি। ভাগ্য ইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক, আবার নিয়তি দেশব্যাপিও হতে পারে। সামগ্রিক দুর্ভাগ্যকে নিয়তির করায়ত্ব আমরা বলতে পারি, যেমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কোন মেজর অ্যাকসিডেন্ট(ট্রেন, বাস, অগ্নি, ভুমিকম্প)। যে কোন সাধারণ মানুষ তার ভাগ্য, যেটা জন্মসূত্রে নিয়ে আসে, নিজের কর্মের জোরে তার কিছুটা হয়তো বদলাতে পারে, কিন্তু নিয়তির চক্রকে ভাঙতে পারে না। তাই আজ যে রাজা, কাল সে ফকির। আবার রাস্তা থেকে মহলে উঠে যাবার গল্পও আছে। এই বদলের সময় মানুষের অধিকারেরও বদল ঘটে। প্রোফেসর কালাম যখন ইসরো-তে রকেট ইঞ্জিনীয়ার হিসেবে কাজ করতেন, তখন তার অধিকারে ছিলো রকেটের বা উপগ্রহের নকশা বানানো। যখন রাষ্ট্রপতি হলেন, তখন অধিকারে এলো কোন উপগ্রহ কি উদ্দেশ্যে পৃথিবীর কোন কক্ষে স্থাপিত হবে তা ডিসাইড করার। এ হলো কর্মের অধিকার, অর্জিত অধিকার। আর্নল্ড সোয়ারজেনেগার যখন টারমিনেটর হয়ে জন কনার্স আর ক্যাথারিন ব্রিউস্টার-কে বাঁচাচ্ছে তখন তার কাছে রয়েছে অভিনেতার অধিকার। আবার সেই ভদ্রলোকই যখন গভরনার হয়ে বসলেন, তখন এলো ক্ষমতার আর আইনের অধিকার। এটাও অর্জিত অধিকার। এ’টা ভাগ্যও বটে।
বড় বড় মানুষের কথা থেকে আসুন এবারে আমাদের পরিবারে চলে আসি। বাবা, মা ভাই, বোন, স্বামী, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, পাড়া পড়শী সকলেরই সকলের ওপরে একটা অধিকার আছে। কারোর ক্ষেত্রে এই অধিকারের সীমা একটু বিস্তারিত, কারোও ক্ষেত্রে কেবল তার্কিক। পিতা হিসেব সন্তানের ওপরে যে অধিকার আমার আছে, প্রতিবেশীর তা নেই। কিন্তু সন্তান যদি সেই অধিকার থেকে আমায় চ্যুত করে, অস্বীকার করে, তাহলে! তখন সেটা আমার ভাগ্য আর নিয়তি। এই হবার ছিলো। জোর করে অধিকারের পতাকা ওড়ানো যায় না। আমার নিজের বাবা ও মা দুজনেরই তাদের শেষ সময়ে আমায় তাদের সন্তান এবং জ্যেষ্ঠ হিসেবে যে অধিকার ছিলো, তার থেকে দূরে রেখেছেন। দুজনের একজনও আমায় তাদের সাথে মেলার শেষ সুযোগ দেন নি। এটা কি? আমার ভাগ্য না’কি আমার নিয়তি? আমি পাশে থাকা সত্ত্বেও আমার সে সুযোগ হয় নি, শেষ যাত্রায় তাঁদের হাত খানি ধরতে। হয়তো তাঁরা তাই চেয়েছিলেন। হয়তো তাদেরও নিয়তি এটাই ছিলো। আমার সহোদর সে হিসেবে ভাগ্যশালী ছিলো। হয়তো আমার কর্মফল, যা ছিলো আমার অমোঘ নিয়তি। আমার অধিকারের মধ্যে পড়ে জ্যেষ্ঠ হিসেবে মুখাগ্নি করার, কিন্তু করতে পারলাম কোই? শেষ বিদায়ের সময় আমি আরোও খানিকটা অপরাধী থেকে গেলাম। আরোও খানিক পাপের বোঝা বাড়লো। অধিকার হেরে গেলো নিয়তির ক্রুর হাসির কাছে। ভাগ্য বললো, এই বিধিলিপি, মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কি?
ব্যাক্তিগত আলোচনার বাইরে এসে এটুকু আমি বলতে পারি, এ জীবনে যা কিছু আছে, তার সবটুকু হয়তো সময়ের সাথে সাথে নেই, আবার যা কোথাও নেই, তাই এসে ধরে নেয় জীবনকে, সারা জীবন বয়ে বেড়ানোর জন্যে। এটা নেহাৎ যোগাযোগ, সুখ আসে না দুঃখ আসে। অধিকারের গর্বে মাথা খারাপ না করে কেবল নিজের কর্মে মন দাও, ওটাই একমাত্র তোমার হাতে। বাকিরা ছকের হিসেবে আসবে যাবে। আমার অধিকার শুধু কাজে, দাবার চাল দেবার মালিক কেবল সেই সর্ব শক্তিমান। ভেবে গেলাম, দেখা পেলাম না। তুমি আছো শুধু মনের গভীরে, অনুভবের আবেশে।

হিমাদ্রী শেখর দত্ত

লেখক

ব্যাথা মোর উঠবে জ্বলে উর্দ্ধ পানে....

আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে
এ জীবন পুণ্য কর
দহন দানে.............

জনগণ যা বলেন

আপনি যা বলেন

খুব সত্যি লিখেছেন।

নিয়তি যেন অমোঘ - এড়ানো যায় না - এবং আগে থেকে আঁচও করে উঠতে পারা যায় না।

ভাগ্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব - না আমি কোন প্রবাল পান্না মুক্তো ধারণের কথা বলছি না - নিয়ন্ত্রিত পরিশ্রম, হার না মানা মানসিকতা দি্যে...।


সুন্দর.। অঅ

অনেক জানা কথা আরো নিবিড়ভাবে জানলাম। নিয়তি হয়তো অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রন করে তবে যেকোনো রকম 'অধিকার'ই অর্জন করতে হয় বলেই বিশ্বাস করি ।

হিমাদ্রীদা, অফ দা টপিক একটা কথা জিজ্ঞাসা করি। বিভিন্ন পোস্টে আপনার হা-হুতাশ দেখছি। কেউ কমেন্ট করছে না। পোস্ট করছে না। ফলে আপনি কমেন্ট করতে পারছেন না এবং পোস্টও করতে পারছেন না।

প্রশ্ন: এর জন্যে আপনি নিজে থেকে কী করেছেন?

রোহণ বাবু
আমি হা হুতাশ করি নি, কেবল বলতে চেয়েছি আগের তুলনায় এখন লেখা পড়ার জন্যে কম পাঠক আসছেন। এর জন্যে আমার হাতে কিছু নেই, যা করতে পারি, এক্সসেপ্ট লিখে যাওয়া। কিন্তু লেখাই এতো কম আসছে, যে কমেন্টস করারও উপায় নেই। তাই লেখাও দিতে পারছি না।
আপনি আমায় কি করতে বলেন ?

লোটাকম্বল সাইটটা কার? এটার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করুন একটু প্লিজ।

৩-রা জানুয়ারীর লেখা এখনও প্রথম পাতায় রয়ে গেছে, তার মানে লেখার পোস্টিং কতটা কমে গেছে বুঝতে পারছো রোহণ ? এটার কারণ আশা করি তোমায় বুঝিয়ে বলতে হবে না।

কারণটা একটু বুঝিয়ে বলুন না হয়।

লেখাটা নিয়ে অবশ্য কোন মন্তব্য তুমিও দাও নি। না হয় খারাপ বলেই লিখতে।

আমার বাবা আমার কবিতা পড়েন না। খারাপ লাগে বলে নয়। আমার লেখা কবিতা ওনাকে সেভাবে আকর্ষণ করে না। ভালো লাগা, খারাপ লাগা ইত্যাদির বাইরেও কিছু ব্যাপার থাকে।

হিমাদ্রীবাবু,

এবার কিন্তু অনেক মন্তব্য জমা হয়ে গেল - আপনার লেখার পরের এপিসোডগুলো এবার নামাতে থাকুন...।

রোহণ
কারণ তোমাকে বোঝাতে হবে, সত্যিই চাইছো? তবে শোন। এটার বেসিক কারণ অধিকাংশ লোকেরাই ব্লগে নিজের লেখা দেখে খুশি হয়। অন্যের লেখা পড়ে কিছু লিকে তাকেও খুশি দেওয়া যায়, তাতে বিশ্বাস করে না। কেউ পড়তে চায় না, কারোর আবার তোমার মতো আকর্ষণের অভাব বা দিক থাকে, তার বাইরে যেতে চায় না। ফলে, সমালোচকের নিজের লেখা দেবার চান্স ক্ষীন থেকে ক্ষীণতর হতে থাকছে সময়ের সাথে। অন্যদিকে লেখা কম আসার দরুণ আমার মতো বেহায়া আর হা হুতাশকারীরা লেখা দিতে চেয়েও লেখা দিতে পারছে না, কেননা মন্তব্য আর লেখা পোস্টাবার অনুপাতে ফেল করে বসে আছি।

লোটা কম্বল কার জন্যে এবার তোমার ভাবার কথা ভাই। আমার কথায় ভালো বা খারাপ কিছুই পাবে না জানি, তুমি জানতে চাইলে তাই বোললাম। আমার হাতে খড়ি এখানে হয়েছিলো তো, তাই একটু বেশি সেন্টিমেন্টাল বোধহয় হয়ে পড়েছি।

ভালো লাগা,খারাপ লাগার বাইরে একজন ব্লগ পরিচালকের আর কি কি ব্যাপার থাকতে পারে তাই ভাবছি।

"এটার বেসিক কারণ অধিকাংশ লোকেরাই ব্লগে নিজের লেখা দেখে খুশি হয়।"

এই জন্যে লোটাকম্বল নয় হিমাদ্রীদা। সরি। এটা করতে হলে ব্লগার ডট কম বা ওয়ার্ডপ্রেসে গিয়ে নিজের ব্লগ খুলে নিলেই হয়। লোটাকম্বল তৈরি করা হয়েছে লেখা এবং পড়ার জন্যে। সেখানে শুধু পোস্ট করে কেটে পড়ব -- এই নীতি নিলে চলবে না।

এই সাইট আমাদের সবার। অতএব পুরানো সবাই যদি ব্যস্ততার কারনে না সতে পারেন লেখা পোস্ট করতে বা পড়ে মন্তব্য করতে, তাহলে নতুনদের আসতে বলুন। এই সাইটের খোঁজ দিন। রেজিস্টার করতে বলুন।

সেটাও যদি ধরে নেন আমিই করব, তাহলে খুব ভুল ভাবছেন হিমাদ্রীদা। আপনাদের মত দারুণ ব্যস্ত না হলেও আমারও বেশ কিছু কাজ আছে। আর কে না জানে ফ্রি ব্রেকফাস্ট বলে কিছু হয় না।

অতএব কাজে লেগে পড়ু্ন...

কিশোর ঘোষাল মহাশয়

মন্তব্য অবশ্যই এসেছে, তবে আমার করা নয়। তাই আমার লেখা পোস্টাবার চান্স এখনও হয়েছে কি'না জানি না। যদি হয়, তবে অবশ্যই লিখবো। না হয়, নিজের জন্যেই লিখবো।

যাক অনেকদিন পর হিমাদ্রিবাবু vs রোহণের মন্তব্য পড়ে বেশ ব্লগ ব্লগ লাগছে - আড্ডাটা ভালোই জমছিল -

হিমাদ্রীবাবু, আর না - এবার আপনার 'মাথেরান...' রহস্যটা ভেদ করুন।

সক্কলে আমার বা আপনার লেখাটিই পড়ার জন্যে মুখিয়ে থাকবেন - এমন চিন্তা করছেন কেন?

আপন মনে লিখে চলুন - আপনি আছেন - আমরাও তো আছি ।

কথাগুলো শুধু হিমাদ্রীদার জন্যে নয়। সবার জন্যেই প্রযোজ্য। পড়তে হবে। লিখতেও হবে। আজকাল সবাই লেখে। পড়ার লোক কমে গেছে।

জীবনানন্দ বলেছিলেন না - 'সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি'?

কথাটা শুধু কবিদের জন্যে সীমিত নয় বোধ হয়, কারণ আমার এও মনে হয়েছে - 'সকলেই পাঠক নয়, কেউ কেউ পাঠক'।

হিমাদ্রীবাবুকে বারবার বলা সত্ত্বেও 'মাথেরান রহস্য' জট খুলছেন না - আমাকে পাঠক হিসেবে পছন্দ হয় নি মনে হচ্ছে।

কিশোর ঘোষাল মহাশয়
এমন অপবাদের বোঝা মাথায় নিতে হবে ভাবি নি। পাঠকের জন্যে এতো কথা রোহণের কাছ থেকে হজম করে গেলাম, আর আপনি বলছেন পাঠক পছন্দ না হওয়া। তোবা, তোবা।

এবার ভাবছি, চোখ কান বুঁজে লিখেই দেবো। মাথেরানের রহস্য আর লুকিয়ে রাখবো না। পড়ে না পসন্দ হলে বলবেন আশা করি।

রোহণ
লোটা কম্বলে আমি একজন অন্ততঃ মেম্বার এনেছিলাম। অলোক ভঞ্জ।

চিচিং ফাঁক


লেখকের সমস্ত